জরুরি নোটিশ:
যুগযুগান্তর পত্রিকার জন্য সারাদেশে জেলা ও উপজেলায় সংবাদ দাতা আবশ্যক।  মোবা: 01842268378 ইমেইল: nskibria2012@gmail.com
স্বপ্নের দেশে এ কোন স্বপ্নভঙ্গের আওয়াজ!

স্বপ্নের দেশে এ কোন স্বপ্নভঙ্গের আওয়াজ!

শেয়ার করুন

বিনোদন ডেস্ক :
ঘর প্রতিটি মানুষের জন্যই প্রশান্তির জায়গা। দিনভর যতো ব্যস্তই থাকি না কেন, দিনশেষে আমরা ফিরে আসি আমাদের ঘরে, আমাদের নিজস্ব স্বর্গে, যে স্থান সবসময়ই তার আপন মানুষদের স্বাগত জানায়। কিন্তু অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য নিউইয়র্কে নিজের একটি ঘর পাওয়া দিনকে দিন বেশ দুরূহ হয়ে উঠেছে। বছর কয়েক আগে এক বন্ধুর জন্য বাসা খুঁজতে গিয়ে জেনেছিলাম, কেউ সামার ভেকেশনে দুইমাসের জন্য দেশে যাচ্ছে, তাই এই স্বল্প সময়ের জন্য বাসাটি ভাড়া দিবেন। আবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে একটি নম্বরে ফোন করে জেনেছিলাম, পরিবারটির প্রবীণ সদস্য দু’জন হজ্জে যাবেন, তাই ব্যয়বহুল এই শহরে দুই মাসের জন্যই বা তারা তাদের রুমটি খালি রাখবেন কেন!
কিন্তু এবার ভিন্ন অভিজ্ঞতা। গত দুইমাস যাবত বাসা খুঁজছিলাম খুব কাছের এক স্বজনের জন্য। সম্প্রতি দেশ থেকে এসেছে পরিবারটি ইমিগ্র্যান্ট হয়ে। এপার্টমেন্ট বিল্ডিংগুলোতে সুপারের সাথে যোগাযোগ করি প্রথমে। ট্যাক্স ফাইল করেছে কিনা, বছরে আয় কত, ৩৬ হাজার ডলারের উপরে কিনা, ক্রেডিট স্কোর ভালো কিনা, পে স্টাব আছে কিনা… ইত্যাদি নানান প্রশ্ন। এসব না থাকলে বাসা ভাড়া দিবে না। এ দেশে নতুন আসা একটি পরিবারের তো এসবের কোনটিই থাকার কথা নয়। অগত্যা সে আশায় গুড়ে বালি। এবার অন্যপথে চেষ্টা শুরু হল। প্রতি সপ্তাহে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকাগুলো নিয়ে আসি নিয়ম করে। বাসা ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে একে একে ফোন দেই কাঙ্ক্ষিত এলাকার বাসার নম্বরগুলোতে। এক সকালে ফোন দেই এস্টোরিয়া এলাকার একটি নম্বরে। ভদ্রলোক বেশ রাগের স্বরে বললেন, ‘একমাস আগেই বাসাটি ভাড়া হয়ে গেছে। পত্রিকাওয়ালারা কেন যে নিষেধ করা সত্ত্বেও বিজ্ঞাপনটি ছাপিয়ে যাচ্ছে বুঝি না।’ এবার পত্রিকায় মার্ক করে রাখা দ্বিতীয় নম্বরে ফোন দেই। ও প্রান্তে নারী কণ্ঠস্বর। বেশ অমায়িক এবং বিনয়ী স্বরে জানালেন, বাসাটি ভাড়া হয়ে গেছে, আপু। সাথে এ-ও জানালেন, তিনি স্প্যানিশদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কেননা, স্প্যানিশরা বাড়িতে টুকিটাকি সমস্যা দেখা দিলে নিজেরাই তা মেরামত করে নেয়। বাড়ির মালিককে কারণে-অকারণে বিরক্ত করেন না। অন্যদিকে বাঙালি ভাড়াটিয়ারা পান থেকে চুন খসলেই বাড়িওয়ালাকে উপর্যুপরি অভিযোগ করতে থাকেন। আজ এই সমস্যা তো কাল ওই সমস্যা।

কুইন্সের সানিসাইডে তিন বেডরুম আর এক বাথরুমের প্রাইভেট হাউজের ভাড়া ২৭০০ ডলার চাইলেন বাংলাদেশি এক বাড়ির মালিক। কথা না বাড়িয়ে ফোন নামিয়ে রাখি। আয়ের দুই-তৃতীয়াংশই যে চলে যাবে বাসা ভাড়ার পেছনে! পরবর্তী নম্বরে ফোন দেই। উডসাইডে দুই বেডরুমের বাসা বেলকনিসহ ভাড়া হবে, জানালেন ফোনের ওপাশ থেকে এক ভদ্রলোক। ভাড়া ২৪০০ ডলার। দেশের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এদেশে নতুন আসা মানুষদের এই শহরে বাড়ির বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা, কিংবা সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখা এক রকম বিলাসিতাই বটে! বরং বেইজমেন্টের আধো আলো আর আধো অন্ধকারে থাকলেও ক্ষতি নেই। অন্তত মাস শেষে বড় অংকের বাড়িভাড়ার টেনশন থেকে তো মুক্ত থাকা যাবে। আমার এমন হন্যে হয়ে বাসা খোঁজা দেখে এক বন্ধু এগিয়ে এলো সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে। জানালো, চলতি পথে এক বাড়ির সামনে সে ‘ফর রেন্ট’ সাইনবোর্ড দেখেছে। ছবি তুলে পাঠিয়ে দিল আমায়। সেই নম্বরে ফোন করলে এক স্প্যানিশ নারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ইংরেজি একেবারেই বুঝেন না। তিনি তার ভাষায় অনর্গল কিছু বলে চলেছেন। একদা স্প্যানিশদের সাথে কাজ করার সুবাদে অল্প-স্বল্প স্প্যানিশ ভাষা শিখেছিলাম একান্তই নিজের সুবিধার্থে। ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশে জানলাম, বাসা নয়, একটি মাত্র রুম ভাড়া দিবেন তিনি ৮৫০ ডলারের বিনিময়ে। দীর্ঘশ্বাস দলা পাকায় বুকের ভেতরে। পরের সপ্তাহে আবারো নতুন পত্রিকা আসে বাজারে। নতুন উদ্যমে বিজ্ঞাপন দেখতে থাকি। সম্ভাব্য পছন্দের এলাকার বাসাগুলোয় লাল কালি দিয়ে শনাক্ত করে রাখি। ফোন করি একে একে। এবার ফোন তোলেন রাশভারী কণ্ঠস্বরের এক ভদ্রলোক। ইস্ট এলমারস্ট এলাকা। আশেপাশে কোন সাবওয়ে স্টেশন নেই। যাতায়াতের জন্য বাসই একমাত্র ভরসা। দুই বেডরুমের বাসা, ভাড়া চাইলেন ২৬০০ ডলার। বললেন, ‘নিজে থাকবো বলে বাড়িটিতে বেশ কিছু সাজসজ্জার কাজ করিয়েছিলাম। কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছি। বাসাটি ভাড়া দিয়ে দিবো। আপনারা সম্ভবত এতো ভাড়া কুলাতে পারবেন না।’ কথাটি একটু আত্মসম্মানে লাগলো যেন! কিংবা লোকটিকে অহংকারী মনে হল। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। তবুও আমতা আমতা করে বলি, ‘ভাইয়া, এদেশে নতুন আসা কারো জন্য ভাড়াটা সত্যিই বেশি হয়ে যায়।

অন্য একদিনের কথা। সেদিন ছিল বুধবার। তুমুল ঝড়-বৃষ্টির বিকেল। চারপাশ অন্ধকারে ডুবে ছিল। একই এলাকায় অন্য একটি এক বেডরুমের বাসার সন্ধান পাওয়া গেল, ভাড়া ১৫০০ ডলার। সহনীয় মনে হল। আবহাওয়া যা-ই থাকুক না কেন, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কেননা, খুব দ্রুতই বাসাগুলো ভাড়া হয়ে যাচ্ছিল। নিউইয়র্ক নগরীতে জনসংখ্যা বেড়েছে ব্যাপক হারে, কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন আবাসন তৈরি হয়নি। আবার অনেকেই এই শহরের ব্যয়বহুল বাড়ি ভাড়া কুলাতে না পেরে অপেক্ষাকৃত সহনীয় বাড়িভাড়ার রাজ্যগুলোতে সপরিবারে চলে যাচ্ছে। কেউ মিশিগান, কেউবা পেনসিলভেনিয়া কিংবা বাফেলো স্থানান্তরিত হচ্ছেন। যাক সে কথা। যে বাড়িটির কথা বলছিলাম, সেখানে পৌঁছাই যখন, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সেটি ছিল ওয়াক ইন বেইজমেন্ট। ভেতরে গিয়ে একটু চমকে যাই। এতো ছোট একটিমাত্র রুম! পাশেই বারান্দার মতো খানিকটা জায়গা। যেটিকে পুরোপুরি রুমও বলা চলে না। বাড়িওয়ালা বললেন, চাইলে এখানেও একটি বেড ফেলতে পারেন।’ স্বপ্নের দেশে এ কোন স্বপ্নভঙ্গের আওয়াজ!
একবুক হতাশা নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসি। ততক্ষণে শহরের রাস্তায় হলুদ সোডিয়াম বাতি জ্বলে উঠেছে। বৃষ্টিস্নাত সড়ক। অফিস ফেরত মানুষের বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা। শাঁই শাঁই করে ছুটে চলা শত শত গাড়ির ভিড়ে হারিয়ে যায় আমার সোনালি রং এর ‘হুন্ডা একর্ড’ গাড়িটি। আমি যেন নিউইয়র্কের ব্যস্ততম সড়কে ছকবাঁধা এক বৃত্তের ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকি, যে বৃত্তের ভেতরে প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির হিসাব মেলে না। মেলে না আরও অনেক হিসাব। রেকর্ডারে গান বেজে চলে …
‘ও মুর্শিদ ও ও ও…
একে আমার ভাঙা ঘর
তার উপরে লরে চড়
কখন জানি সেই ঘর ভাইঙ্গা পড়ে রে …’

Print Friendly, PDF & Email

যুগযুগান্তর পত্রিকা. নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 Jugjugantor24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com